‘বহুরূপী’ সুবোধ ঘোষের একটি গুরুত্বপূর্ণ গল্প, যেখানে হরিদার অভিনয়প্রতিভা, স্বাধীনচেতা মন, দারিদ্র্য এবং শিল্পীসত্তার একটি বিশেষ দিক ফুটে উঠেছে।
মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতির কথা মাথায় রেখে এখানে বহুরূপী গল্পের MCQ, অতিসংক্ষিপ্ত, সংক্ষিপ্ত এবং রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর বিষয়ভিত্তিকভাবে সাজানো হয়েছে। প্রশ্নগুলির উত্তর সহজ ভাষায় দেওয়া হয়েছে, যাতে পড়া, বোঝা এবং পরীক্ষার আগে দ্রুত revision—তিনটিই সহজ হয়।
বহুরূপী গল্প: অধ্যায়ের মূল তথ্য
বহুরূপী গল্পের MCQ প্রশ্ন ও উত্তর
নিচের বহুনির্বাচনী প্রশ্নগুলি গল্পের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, চরিত্র, ছদ্মবেশ এবং বিভিন্ন তথ্যকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে।
বহুরূপী গল্পের অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর
এখানে ‘আমরা’ বলতে গল্পকার এবং তাঁর বন্ধু ভবতোষ, অনাদি-সহ অন্যান্য বন্ধুদের বোঝানো হয়েছে।
তাঁরা জগদীশবাবুর বাড়িতে আসা এক উঁচুদরের সন্ন্যাসীর কথা বলেছিলেন। সন্ন্যাসী হিমালয়ের গুহায় থাকেন, তাঁর বয়স হাজার বছরের বেশি এবং তিনি বছরে একটি মাত্র হরীতকী খান—এই কথাগুলিই তাঁরা হরিদাকে বলেছিলেন।
হরিদা জগদীশবাবুর বাড়িতে আসা সন্ন্যাসীর মাহাত্ম্যের কথা শুনে তাঁর পায়ের ধুলো নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সন্ন্যাসী চলে যাওয়ায় সেই সুযোগ আর পাননি। তাই তাঁর আক্ষেপ হয়েছিল।
সন্ন্যাসী সাধারণ মানুষকে পায়ের ধুলো নিতে দিতেন না। অথচ জগদীশবাবু সোনার বোল লাগানো কাঠের খড়ম তাঁর পায়ের কাছে ধরলে সন্ন্যাসী তা পরার জন্য পা বাড়িয়ে দেন। সেই সুযোগে জগদীশবাবু তাঁর পায়ের ধুলো নেন। এই ঘটনাটিই হরিদার কাছে মজার বলে মনে হয়েছিল।
সন্ন্যাসীর আচরণে হরিদার বিশ্বাসে টান পড়েছিল। একই সঙ্গে জগদীশবাবুর বাড়িতে নিজের বহুরূপীর খেলা দেখিয়ে কিছু উপার্জনের কথাও তাঁর মনে এসেছিল। তাই গল্প শুনে তিনি গম্ভীর হয়ে যান।
কোনো অফিস, দোকান বা অন্য কোথাও নিয়ম মেনে ঘড়ির কাঁটা ধরে প্রতিদিন চাকরি করার কথা বলা হয়েছে। হরিদা এই বাঁধাধরা জীবন পছন্দ করতেন না।
কটকটে লাল চোখ, মুখ থেকে লালা ঝরা, কোমরে ছেঁড়া কম্বল এবং গলায় টিনের কৌটোর মালা পরা এক পাগলের ছদ্মবেশে হরিদা সেখানে হাজির হয়েছিলেন।
বাসের ড্রাইভার কাশীনাথ কথাটি বলেছিল। পাগলের ছদ্মবেশে হরিদা হাতে থান ইট নিয়ে বাসযাত্রীদের দিকে তেড়ে যাওয়ায় চারদিকে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। তাই তাঁকে থামাতে কাশীনাথ এই কথা বলেছিল।
এক সন্ধ্যায় হরিদা রূপসি বাইজির ছদ্মবেশে ঘুঙুরের শব্দ করতে করতে শহরের পথে বেরিয়েছিলেন। দোকানদার তাঁকে চিনতে পেরেছিল বলেই হেসে ফেলেছিল।
দয়ালবাবুর লিচু বাগানে পুলিশের ছদ্মবেশে হরিদা চারজন স্কুলছেলেকে ধরলে স্কুলের মাস্টারমশাই এই কথা বলেছিলেন।
স্কুলের মাস্টারমশাই হরিদার পুলিশ সাজার প্রশংসা করে এই কথা বলেছিলেন। হরিদা যে আসলে নকল পুলিশ, তা জানার পরে এবং আট আনা ঘুষ দিয়ে ছাত্রদের ছাড়িয়ে আনার পর তিনি এই মন্তব্য করেন।
বিভিন্ন ছদ্মবেশে ঘুরে হরিদার সাধারণত খুব সামান্য রোজগার হত। তাই জগদীশবাবুর বাড়িতে খেলা দেখিয়ে কিছুটা বেশি টাকা পাওয়ার আশা থেকেই তাঁর উৎসাহ জেগেছিল।
হরিদা সন্ন্যাসীর গল্প শুনে গম্ভীর হয়ে যাওয়ায় কথক ও তাঁর বন্ধুরা সন্দেহ করেছিলেন যে হরিদার মাথায় নিশ্চয় কোনো নতুন মতলব এসেছে। পরে জগদীশবাবুর বাড়িতে খেলা দেখানোর পরিকল্পনা করায় তাঁদের সন্দেহ সত্যি প্রমাণিত হয়।
সন্ধ্যায় চারদিকে চাঁদের আলোর স্নিগ্ধ ও শান্ত উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে ছিল। ফুরফুরে বাতাস বইছিল এবং জগদীশবাবুর বাগানের গাছের পাতাগুলি ঝিরঝির শব্দ করছিল। এই মায়াময় পরিবেশেই বিরাগীরূপী হরিদার আবির্ভাব ঘটে।
আদুড় গায়ে সাদা উত্তরীয়, ছোটো সাদা থান, মাথায় সাদা চুল, ধুলো মাখা পা এবং কাঁধে ঝোলা নিয়ে এক অদ্ভুত বিরাগীকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জগদীশবাবু চমকে উঠেছিলেন।
বিরাগীর ছদ্মবেশে হরিদা কথাটি জগদীশবাবুকে বলেছিলেন। জগদীশবাবু দূর থেকে বিরাগীকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। সেই আচরণের মধ্য দিয়ে তাঁর অহংকারের দিকে ইঙ্গিত করেই হরিদা প্রশ্নটি করেছিলেন।
বিরাগীর মতে, সমস্ত পার্থিব সুখের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে অনন্তের সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারলেই পরমসুখ লাভ করা যায়।
বিরাগী বলেছিলেন, ধন, জন ও যৌবন আসলে মোহময় বঞ্চনা। মন ও প্রাণ দিয়ে একজনের আপন হতে পারলে সৃষ্টির সমস্ত ঐশ্বর্য লাভ করা যায়।
বিরাগীর মতে মানুষের অন্তরেই ঈশ্বরের বাস এবং মানুষের হৃদয়েই সব তীর্থের মিলনস্থল। তাই আলাদাভাবে তীর্থভ্রমণের প্রয়োজন নেই।
হরিদার বাড়িতে ফিরে তাঁর পোশাক ও সাজ দেখে ভবতোষরা বুঝতে পেরেছিল যে বিরাগী আসলে হরিদাই ছিলেন। এই বিষয়টি বুঝে ভবতোষ চমকে উঠেছিল।
জগদীশবাবু বিরাগীরূপী হরিদাকে প্রণামীর টাকা দিতে চাইলে হরিদা তা গ্রহণ করেননি। কারণ বিরাগীর চরিত্রে থেকে টাকা গ্রহণ করলে তাঁর অভিনয়ের স্বাভাবিকতা ও চরিত্রের মর্যাদা নষ্ট হয়ে যেত। এই প্রসঙ্গেই তিনি কথাটি বলেন।
জগদীশবাবুর দেওয়া একশো এক টাকার প্রণামী হরিদা গ্রহণ না করে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। দরিদ্র অবস্থায় এমন টাকা প্রত্যাখ্যান করাকেই এখানে হরিদার ভুল বলা হয়েছে।
সন্ন্যাসী জগদীশবাবুর বাড়িতে সাত দিন ছিলেন।
হরিদা পেশায় একজন বহুরূপী ছিলেন। বিভিন্ন ছদ্মবেশে খেলা দেখিয়ে সামান্য রোজগার করাই ছিল তাঁর জীবিকার প্রধান উপায়।
জগদীশবাবু একজোড়া কাঠের খড়মে সোনার বোল লাগিয়ে সন্ন্যাসীর পায়ের কাছে ধরেছিলেন। সন্ন্যাসী খড়ম পরার জন্য পা বাড়ালে সেই সুযোগে জগদীশবাবু তাঁর পায়ের ধুলো সংগ্রহ করেছিলেন।
হরিদা দয়ালবাবুর লিচু বাগানে পুলিশ সেজে চারজন স্কুলছেলেকে ধরে ফেলেছিলেন। পরে স্কুলের মাস্টারমশাই ক্ষমা চেয়ে আট আনা ঘুষ দিলে তিনি ছেলেদের ছেড়ে দেন।
হরিদা কখনও পাগল, কখনও রূপসি বাইজি, বাউল, কাপালিক, কাবুলিওয়ালা, ফিরিঙ্গি কেরামিন সাহেব, পুলিশ এবং বিরাগীর সাজ নিয়েছিলেন।
রূপসি বাইজির সাজে হরিদা সবচেয়ে বেশি আয় করেছিলেন। তিনি মোট আট টাকা দশ আনা পেয়েছিলেন।
বহুরূপী গল্পের সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর
হরিদা সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পের মুখ্য চরিত্র। তিনি পেশায় একজন বহুরূপী। অভাব তাঁর নিত্যসঙ্গী হলেও বাঁধাধরা চাকরির জীবন তিনি পছন্দ করতেন না।
বক্তা ও তাঁর বন্ধুরা হরিদাকে জগদীশবাবুর বাড়িতে আসা এক সন্ন্যাসীর কথা বলেছিলেন। সেই সন্ন্যাসী হিমালয়ের গুহায় থাকেন, বছরে একটি মাত্র হরীতকী খান এবং তাঁর বয়স হাজার বছরের বেশি বলে তাঁরা জানিয়েছিলেন।
জগদীশবাবুর বাড়িতে ওই সন্ন্যাসী সাত দিন ছিলেন। তিনি হিমালয়ের গুহায় থাকেন বলে জানা যায়। তাঁর বয়স হাজার বছরেরও বেশি এবং সারাবছরে তাঁর খাদ্য ছিল একটি মাত্র হরীতকী। সাধারণ মানুষকে তিনি তাঁর পায়ের ধুলো নিতে দিতেন না। কিন্তু জগদীশবাবুর দেওয়া সোনার বোল লাগানো খড়ম গ্রহণ করেন এবং একশো টাকার নোটও নেন। এই আচরণের মধ্যেই তাঁর চরিত্রের বৈপরীত্য প্রকাশ পায়।
সন্ন্যাসী নিজেকে সর্বত্যাগী বলে প্রতিষ্ঠিত করলেও সোনার বোল লাগানো কাঠের খড়মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পা বাড়িয়ে দেন। পরে জগদীশবাবুর দেওয়া টাকাও গ্রহণ করেন। তাঁর কথিত বৈরাগ্য ও এই আচরণের মধ্যে যে বৈপরীত্য দেখা যায়, সেটিই ঘটনাটিকে মজার করে তুলেছে।
হরিদার ব্যক্তিগত জীবন যেমন অভাবের, তেমনই তাঁর পেশাগত জীবন নানা ছদ্মবেশ ও অভিনয়ে ভরা। তিনি কখনও পাগল, কখনও রূপসি বাইজি, কখনও বাউল বা কাপালিক সেজেছেন। আবার পুলিশ সেজে স্কুলের ছেলেদের ধরেছেন। তাঁর জীবনের নাটকীয়তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রকাশ জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগীর ছদ্মবেশে দেখা যায়।
দরিদ্র হওয়া সত্ত্বেও বাঁধাধরা চাকরি তাঁর পছন্দ ছিল না। অভিনয়ের স্বাধীনতা ও বৈচিত্র্যই তাঁর জীবনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
জগদীশবাবু ছিলেন ধনী, শিক্ষিত ও ভদ্র মানুষ। তাঁর স্বভাবের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল সাধু-সন্ন্যাসীদের প্রতি গভীর ভক্তি। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন কৃপণ এবং নিজের সম্পত্তি নিয়ে তাঁর অহংকারও ছিল।
এক সন্ধ্যায় বারান্দার সিঁড়ির কাছে অদ্ভুত পোশাকে এক বিরাগীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি চমকে উঠেছিলেন। বিরাগীর শীর্ণ শরীর, সাদা উত্তরীয়, ছোটো থান, ধুলো মাখা পা, কাঁধের ঝোলা এবং শান্ত উজ্জ্বল দৃষ্টি তাঁকে বিস্মিত করেছিল।
বিরাগীর ছদ্মবেশে হরিদা জগদীশবাবুর কাছ থেকে একশো এক টাকা নিতে অস্বীকার করেছিলেন। কারণ তাঁর মতে, একজন সত্যিকারের বিরাগী অর্থের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারেন না। টাকা গ্রহণ করলে তাঁর অভিনয়ের চরিত্রের সঙ্গে সেই আচরণের মিল থাকত না।
এই ঘটনা হরিদার শিল্পীসত্তা, সততা, আত্মসম্মান এবং পেশার প্রতি নিষ্ঠাকে প্রকাশ করে। দারিদ্র্যের মধ্যেও তিনি অভিনয়ের মর্যাদা নষ্ট করতে চাননি। তাই হরিদা শুধু একজন বহুরূপী নন, একজন নিষ্ঠাবান শিল্পী হিসেবেও ধরা পড়েছেন।
জগদীশবাবু প্রথমে বিরাগীকে যথাযথভাবে অভ্যর্থনা না করায় বিরাগী কিছুটা অসন্তুষ্ট হন। পরে জগদীশবাবু ক্ষমা চাইলে বিরাগী নিজেকে রাগের ঊর্ধ্বে বলে পরিচয় দেন।
বিরাগীর চরিত্রে প্রকৃত বৈরাগ্যের আদর্শ ফুটে ওঠে। তিনি থাকার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন, দানের অর্থ গ্রহণ করেন না এবং তীর্থভ্রমণের পরিবর্তে মানুষের অন্তরের মধ্যে ঈশ্বরের উপস্থিতির কথা বলেন। জগদীশবাবুর একশো এক টাকার থলি পড়ে থাকলেও তিনি তার দিকে ফিরে তাকাননি।
জগদীশবাবু গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্বচরিত্র। তিনি ধনী, প্রবীণ, শিক্ষিত ও সৌম্য-শান্ত স্বভাবের মানুষ হলেও কৃপণ। সাধু-সন্ন্যাসীদের প্রতি তাঁর প্রবল ভক্তি ছিল।
তাঁর ভক্তির মধ্যে যেমন ঈশ্বরবিশ্বাস ছিল, তেমনই নিজের সুখ-শান্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও ছিল। সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো পাওয়ার জন্য তিনি কৌশল অবলম্বন করেছিলেন এবং বিরাগীর ছদ্মবেশে হরিদার কাছেও আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য নত হয়েছিলেন। তাঁর এই চরিত্রই হরিদার বিরাগী সাজার সাফল্যকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
গল্পে হিমালয়বাসী সন্ন্যাসীকে অত্যন্ত উচ্চস্তরের সাধু হিসেবে পরিচয় করানো হয়। তিনি হিমালয়ের গুহায় থাকেন, বছরে একটি হরীতকী খান এবং তাঁর বয়স হাজার বছরেরও বেশি বলে প্রচারিত হয়।
কিন্তু তাঁর আচরণে বৈপরীত্য দেখা যায়। সাধারণ মানুষকে পায়ের ধুলো নিতে না দিলেও সোনার বোল লাগানো খড়ম দেখে তিনি পা বাড়িয়ে দেন এবং জগদীশবাবুর দেওয়া অর্থও গ্রহণ করেন। তাই তাঁর কথিত বৈরাগ্য ও আচরণের মধ্যে অসংগতি স্পষ্ট।
বহুরূপী গল্পের রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর
কথক ও তাঁর বন্ধুরা হরিদাকে জগদীশবাবুর বাড়িতে আসা এক সন্ন্যাসীর গল্প বলেছিলেন। সন্ন্যাসী হিমালয়ের গুহায় থাকেন, বছরে একটি মাত্র হরীতকী খান এবং তাঁর বয়স হাজার বছরেরও বেশি—এমন নানা কথা তাঁরা হরিদাকে জানান। তাঁর পায়ের ধুলো পাওয়াও অত্যন্ত দুর্লভ বলে জানানো হয়।
এই গল্প শুনে হরিদা গম্ভীর হয়ে যান। কারণ তাঁর মনে সন্ন্যাসীর কথিত বৈরাগ্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। একই সঙ্গে জগদীশবাবুর বাড়িতে নিজের বহুরূপীর খেলা দেখিয়ে কিছু উপার্জনের সম্ভাবনাও তাঁর মনে এসেছিল। পরে তিনি বন্ধুদের জগদীশবাবুর বাড়িতে খেলা দেখতে যেতে বলেন। ফলে তাঁর গম্ভীর হয়ে যাওয়ার পিছনে চিন্তা, কৌতূহল এবং নিজের শিল্পকে কাজে লাগানোর ইচ্ছা—সবই কাজ করেছিল।
হরিদা সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র। তিনি পেশায় বহুরূপী। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন অভাবের হলেও বাঁধাধরা চাকরি বা নিয়মিত কাজ তাঁর পছন্দ ছিল না।
হরিদার পেশাগত জীবন নানা ছদ্মবেশে ভরা। কখনও তিনি পাগল সেজে বাস স্ট্যান্ডে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন, কখনও রূপসি বাইজি সেজে শহরের মানুষকে চমকে দিয়েছেন। আবার পুলিশ সেজে স্কুলের চারজন ছেলেকে ধরে মাস্টারমশাইয়ের কাছ থেকে আট আনা ঘুষ নিয়েছেন।
তাঁর অভিনয়জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগীর ছদ্মবেশ। এই সাজে তিনি এতটাই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছিলেন যে জগদীশবাবু তাঁকে সত্যিকারের বিরাগী মনে করেছিলেন। এমনকি একশো এক টাকা দেওয়ার পরও হরিদা তা গ্রহণ করেননি। এইসব ঘটনাই তাঁর জীবনের নাটকীয় বৈচিত্র্যকে প্রকাশ করে।
জগদীশবাবু ছিলেন একজন ধনী, শিক্ষিত, ভদ্র ও মার্জিত মানুষ। তিনি সৌম্য-শান্ত চেহারার অধিকারী হলেও কৃপণ ছিলেন। সাধু-সন্ন্যাসীদের প্রতি তাঁর গভীর ভক্তি ছিল এবং তাঁদের সন্তুষ্ট করে নিজের সুখ-শান্তি লাভ করার প্রবণতাও তাঁর মধ্যে ছিল।
এক চাঁদভরা শান্ত সন্ধ্যায় বারান্দার সিঁড়ির কাছে বিরাগীরূপী হরিদাকে দেখে তিনি চমকে ওঠেন। বিরাগীর আদুড় শরীর, সাদা উত্তরীয়, ছোটো থান, শীর্ণ দেহ, ধুলো মাখা হাত-পা, কাঁধের ঝোলা এবং শান্ত অথচ উজ্জ্বল দৃষ্টি তাঁকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছিল যে তাঁর মনে হয়েছিল বিরাগী যেন অন্য কোনো জগতের মানুষ।
বক্তা হলেন গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিদা। জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগীর ছদ্মবেশে অভিনয় করার পর জগদীশবাবু তাঁকে একশো এক টাকা প্রণামী দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হরিদা সেই টাকা গ্রহণ করেননি।
তাঁর বক্তব্য ছিল, বিরাগী যদি অর্থের প্রতি লোভ দেখান, তাহলে তাঁর অভিনয়ের চরিত্রের সঙ্গে সেই আচরণের মিল থাকবে না। অর্থ গ্রহণ করলে তাঁর ‘ঢং নষ্ট’ হয়ে যাবে।
এই ঘটনা হরিদার শিল্পীসত্তা, সততা, আত্মমর্যাদা এবং পেশার প্রতি নিষ্ঠাকে প্রকাশ করে। তিনি দরিদ্র ছিলেন এবং অনেক সময় তাঁর উনানের হাঁড়িতে ভাতের বদলে শুধু জল ফুটত। তবুও অভিনয়ের মর্যাদা রক্ষার জন্য তিনি একশো এক টাকা প্রত্যাখ্যান করেন। এই আত্মসংযমই হরিদাকে সাধারণ বহুরূপীর চেয়ে আলাদা করে তোলে।
বিরাগীর ছদ্মবেশে হরিদা জগদীশবাবুর বাড়িতে গেলে জগদীশবাবু তাঁকে যথাযথভাবে অভ্যর্থনা জানাতে পারেননি। এতে বিরাগী অসন্তুষ্ট হন। জগদীশবাবু নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইলে বিরাগী বলেন যে তিনি বিরাগী এবং তাঁর মধ্যে রাগের কোনো স্থান নেই।
এরপর বিরাগীর আচরণে প্রকৃত বৈরাগ্যের একটি আদর্শ ফুটে ওঠে। তিনি জগদীশবাবুর থাকার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন, দানের অর্থ গ্রহণ করেন না এবং তীর্থভ্রমণের পরিবর্তে মানুষের অন্তরের মধ্যে ঈশ্বরের উপস্থিতির কথা বলেন।
শেষ পর্যন্ত জগদীশবাবুর দেওয়া একশো এক টাকার থলি সিঁড়িতে পড়ে থাকলেও তিনি তার দিকে ফিরে তাকাননি। এই আচরণের মধ্য দিয়ে বিরাগীর চরিত্রে সংযম, নির্লোভতা ও আত্মমর্যাদার প্রকাশ ঘটে।
জগদীশবাবু গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্বচরিত্র। তিনি যথেষ্ট ধনী ও প্রবীণ ব্যক্তি। তাঁর চেহারায় সৌম্য ও শান্ত ভাব থাকলেও তিনি কৃপণ স্বভাবের।
সাধু-সন্ন্যাসীদের প্রতি তাঁর প্রবল ভক্তি ছিল। হিমালয়বাসী সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো পাওয়ার জন্য তিনি সোনার বোল লাগানো কাঠের খড়ম ব্যবহার করেছিলেন। আবার বিরাগীরূপী হরিদাকে দেখে তিনিও তাঁর প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন।
জগদীশবাবুর চরিত্রের মধ্যে ভক্তির পাশাপাশি নিজের সুখ-শান্তির আকাঙ্ক্ষা ও সম্পদের অহংকারও দেখা যায়। গল্পের কাহিনিতে তাঁর এই চরিত্রই হরিদার বিরাগী সাজের সাফল্যকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
গল্পে হিমালয়বাসী সন্ন্যাসীকে অত্যন্ত উচ্চস্তরের সাধু হিসেবে পরিচয় করানো হয়েছে। তিনি জগদীশবাবুর বাড়িতে সাত দিন ছিলেন। তাঁর বাসস্থান হিমালয়ের গুহা এবং সারাবছরে তিনি একটি মাত্র হরীতকী খান বলে জানা যায়।
কিন্তু তাঁর আচরণে কথিত বৈরাগ্যের সঙ্গে বাস্তব আচরণের অসঙ্গতি দেখা যায়। তিনি সাধারণ মানুষকে পায়ের ধুলো নিতে দেন না, অথচ সোনার বোল লাগানো খড়ম দেখে পা বাড়িয়ে দেন। জগদীশবাবুর দেওয়া অর্থও তিনি গ্রহণ করেন।
তাই তাঁর কথিত সর্বত্যাগী চরিত্রের সঙ্গে তাঁর আচরণের মধ্যে যে বৈপরীত্য দেখা যায়, তার ভিত্তিতে তাঁকে প্রকৃত সন্ন্যাসী বলে মনে হয় না।
হরিদার পেশাই ছিল বিভিন্ন রূপ ধারণ করে মানুষের সামনে অভিনয় করা। তাই তাঁর ছদ্মবেশগুলি শহরের সাধারণ জীবনে নানা অদ্ভুত ও মজার ঘটনার সৃষ্টি করত।
একদিন তিনি পাগলের ছদ্মবেশে চকের বাস স্ট্যান্ডে উপস্থিত হয়ে হাতে থান ইট নিয়ে বাসযাত্রীদের দিকে তেড়ে যান। তাঁর সাজ এত বাস্তব ছিল যে চারদিকে আতঙ্ক তৈরি হয়।
আরেকদিন তিনি রূপসি বাইজি সেজে সন্ধ্যার সময় শহরের পথে বেরিয়ে সবাইকে অবাক করে দেন। এই সাজেই তিনি সবচেয়ে বেশি টাকা উপার্জন করেছিলেন।
আবার দয়ালবাবুর লিচু বাগানে পুলিশ সেজে চারজন স্কুলছেলেকে ধরে মাস্টারমশাইয়ের কাছ থেকে আট আনা ঘুষ নেন। তাঁর অভিনয়ের সর্বোচ্চ সাফল্য দেখা যায় জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগীর ছদ্মবেশে।
বাঁধাধরা জীবন পছন্দ না হওয়ায় হরিদা বহুরূপীর জীবন বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল নাটকীয় বৈচিত্র্য। এই বৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে তিনি শহরের জীবনে একের পর এক চমৎকার ঘটনা সৃষ্টি করতেন।
পাগলের ছদ্মবেশে তিনি চকের বাস স্ট্যান্ডে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিলেন। রূপসি বাইজির সাজে সবাইকে অবাক করেছিলেন এবং এই সাজে তাঁর সবচেয়ে বেশি উপার্জন হয়েছিল। আবার পুলিশ সেজে স্কুলের ছেলেদের ধরে মাস্টারমশাইয়ের কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছিলেন।
তাঁর অভিনয়ের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগীর ছদ্মবেশ। তাঁর সাজ, কথাবার্তা ও আচরণ এতটাই বিশ্বাসযোগ্য ছিল যে জগদীশবাবু তাঁকে সত্যিকারের বিরাগী বলে মনে করেছিলেন। এমনকি কথক, অনাদি ও ভবতোষও প্রথমে তাঁকে চিনতে পারেনি।
জগদীশবাবুর দেওয়া একশো এক টাকা প্রত্যাখ্যান করে হরিদা তাঁর বিরাগীর সাজকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলেন। তাই বহুরূপী হিসেবে হরিদা অত্যন্ত সফল ছিলেন।
হরিদা জগদীশবাবুর বাড়িতে আসা তথাকথিত উঁচুদরের সন্ন্যাসীর কথা শুনে বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর কথিত বৈরাগ্যের সঙ্গে আচরণের মিল নেই। প্রকৃত বিরাগী কেমন হওয়া উচিত, তা নিজের অভিনয়ের মাধ্যমে দেখানোর উদ্দেশ্যেই হরিদা বিরাগীর ছদ্মবেশে জগদীশবাবুর বাড়িতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন।
জ্যোৎস্নালোকিত সন্ধ্যায় সাদা উত্তরীয়, ছোটো থান, কাঁধের ঝোলা এবং গীতার সঙ্গে হরিদা এমন এক বিরাগীর রূপ ধারণ করেন যে জগদীশবাবু তাঁকে সত্যিকারের সাধু বলে মনে করেন।
জগদীশবাবু তাঁকে তুষ্ট করার জন্য একশো এক টাকা প্রণামী দিতে চাইলেও হরিদা তা গ্রহণ করেননি। তাঁর মতে, টাকা নিলে বিরাগীর চরিত্রের ‘ঢং নষ্ট’ হয়ে যেত। শেষ পর্যন্ত টাকা ফেলে রেখে তিনি চলে আসেন। এই ঘটনাই তাঁর অভিনয়, শিল্পীসত্তা এবং বৈরাগ্যের আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করে।
হরিদা শুধু বিভিন্ন ছদ্মবেশ ধারণ করে মানুষের মনোরঞ্জন করতেন না; তাঁর অভিনয়ের মধ্যে অনেক সময় এমন মানবিক গুণ প্রকাশ পেত, যা তাঁকে সাধারণ বহুরূপীর সীমার বাইরে নিয়ে যায়।
বিশেষ করে বিরাগীর ছদ্মবেশে তাঁর চরিত্রের এই দিকটি স্পষ্ট হয়। দরিদ্র হওয়া সত্ত্বেও তিনি জগদীশবাবুর দেওয়া একশো এক টাকা গ্রহণ করেননি। কারণ তাঁর অভিনীত বিরাগী অর্থের প্রতি আসক্ত হতে পারে না। নিজের শিল্পের মর্যাদা রক্ষার জন্য এই ত্যাগ তাঁর চরিত্রকে অসাধারণ করে তোলে।
তাই হরিদার বহুরূপী সাজ শুধু অভিনয়ের বাহ্যিক রূপ নয়; তার মধ্যে সততা, আত্মসংযম ও শিল্পের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাও প্রকাশ পেয়েছে।
হরিদা দরিদ্র মানুষ হলেও গতে বাঁধা চাকরি করতে চান না। তিনি স্বাধীনচেতা, নির্লোভ, চিন্তাশীল এবং শিল্পীমনের অধিকারী। তাঁর জীবনের বৈচিত্র্য বিভিন্ন ছদ্মবেশে অভিনয় করা এবং সেই অভিনয় থেকেই সামান্য রোজগার করা।
কখনও তাঁকে পাগল সেজে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে দেখা যায়, কখনও রূপসি বাইজি সেজে মানুষকে অবাক করতে দেখা যায়। নিজের অভিনয়প্রতিভার কারণে তিনি পুলিশ সেজেও সকলকে বিশ্বাস করাতে পেরেছিলেন।
কিন্তু এই প্রতিভাবান শিল্পীর জীবন একই সঙ্গে দারিদ্র্যে পূর্ণ। অনেক সময় তাঁর উনানের হাঁড়িতে ভাতের বদলে শুধু জল ফুটত। তবুও তিনি বাঁধাধরা জীবনে যেতে চাননি।
জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগীর ছদ্মবেশে তিনি একশো এক টাকা প্রত্যাখ্যান করেন। এই ঘটনা দেখায় যে তাঁর শিল্পীসত্তা ও আত্মমর্যাদা অর্থের চেয়েও বড়ো ছিল। কিন্তু সমাজে তাঁর মতো একজন শিল্পীর প্রকৃত মর্যাদা না পাওয়াই তাঁর জীবনের মর্মান্তিক দিক।
এক শান্ত ও জ্যোৎস্নালোকিত সন্ধ্যায় জগদীশবাবু বারান্দায় বসেছিলেন। সেই সময় সিঁড়ির কাছে বিরাগীর ছদ্মবেশে হরিদার আবির্ভাব ঘটে। তাঁর আদুড় গায়ে সাদা উত্তরীয়, পরনে ছোটো থান, কাঁধে ঝোলা এবং চোখে শান্ত ও উজ্জ্বল দৃষ্টি ছিল।
জগদীশবাবু তাঁকে সত্যিকারের বিরাগী মনে করেন এবং তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা দেখান। বিরাগী তাঁকে ধন-সম্পদ, মোহ এবং প্রকৃত সুখ সম্পর্কে নানা কথা বলেন। তীর্থভ্রমণের প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করে তিনি বলেন, মানুষের অন্তরের মধ্যেই সব তীর্থের মিলন।
জগদীশবাবু বিরাগীকে তীর্থভ্রমণের জন্য একশো এক টাকা দিতে চাইলে তিনি তা গ্রহণ করেননি। টাকার থলি সিঁড়িতে পড়ে থাকলেও বিরাগী তার দিকে ফিরে তাকাননি। এভাবেই হরিদার বিরাগীর অভিনয় পূর্ণতা লাভ করে।
‘বহুরূপী’ গল্পের প্রস্তুতির সময় শুধু MCQ মুখস্থ না করে হরিদার চরিত্র, তাঁর বিভিন্ন ছদ্মবেশ, জগদীশবাবুর চরিত্র, হিমালয়বাসী সন্ন্যাসীর বৈপরীত্য এবং বিরাগীরূপী হরিদার ঘটনাটি ভালোভাবে বুঝে পড়া গুরুত্বপূর্ণ।
বহুরূপী গল্পের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি এক নজরে
আরও পড়ুন
‘বহুরূপী’ গল্পের আরও প্রশ্নোত্তর ও মাধ্যমিক বাংলা প্রস্তুতির সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি একসঙ্গে সাজিয়ে পড়লে অধ্যায়টি revision করা আরও সহজ হবে।
