Cademy
SuggestionsBengaliWBBSE

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ | Chittaranjan Das – Bangla Rachana

28 Aug 2026 0 views

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম বিশিষ্ট নেতা, আইনজীবী ও সমাজসেবী। দেশকে ব্রিটিশ শাসনের বন্ধন থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে তিনি নিজের কর্মজীবন, অর্থ ও ব্যক্তিগত সুবিধা পর্যন্ত ত্যাগ করেছিলেন।

আইনজীবী হিসেবে তাঁর অসাধারণ প্রতিভা যেমন তাঁকে খ্যাতি এনে দিয়েছিল, তেমনই স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর নিষ্ঠা ও আত্মত্যাগ তাঁকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে ‘দেশবন্ধু’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ – বাংলা রচনা

বিষয় তথ্য
নাম চিত্তরঞ্জন দাশ
পরিচিতি দেশবন্ধু
জন্ম ৫ নভেম্বর, ১৮৭০
জন্মস্থান কলকাতা
পিতা ভুবনমোহন দাশ
মাতা নিস্তারণী দেবী
প্রধান পরিচয় আইনজীবী, স্বাধীনতা সংগ্রামী, রাজনৈতিক নেতা ও সমাজসেবী
মৃত্যু ১৬ জুন, ১৯২৫

ভূমিকা

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বহু মহান দেশপ্রেমিক তাঁদের জীবন দেশের জন্য উৎসর্গ করেছেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। দেশের স্বাধীনতা এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি দীর্ঘদিন সংগ্রাম করেছেন।

তিনি মনে করতেন, দেশের মানুষের আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। তাই একজন সফল আইনজীবীর স্বচ্ছন্দ জীবন ছেড়ে তিনি জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন।

দেশবন্ধু নামের তাৎপর্য

দেশের সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা, ত্যাগ এবং স্বাধীনতার জন্য নিরলস সংগ্রামের স্বীকৃতি হিসেবেই মানুষ তাঁকে ভালোবেসে ‘দেশবন্ধু’ নামে অভিহিত করেছিল।

জন্ম ও বংশপরিচয়

চিত্তরঞ্জন দাশ ১৮৭০ সালের ৫ নভেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের পৈতৃক নিবাস ছিল বিক্রমপুরের তেলিরবাগ গ্রামে। তাঁর পিতা ভুবনমোহন দাশ ছিলেন একজন পরিচিত আইনজীবী। মাতা ছিলেন নিস্তারিণী দেবী।

পরিবারের শিক্ষিত পরিবেশ এবং জাতীয় চেতনা তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ছোটবেলা থেকেই তিনি অধ্যবসায়ী ও মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

পারিবারিক পরিবেশ

শিক্ষা ও সংস্কৃতির পরিবেশে বেড়ে ওঠার ফলে চিত্তরঞ্জনের চিন্তাভাবনা ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়। পরবর্তীকালে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পরাধীনতার বাস্তবতা তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলে।

ছাত্রজীবন ও উচ্চশিক্ষা

চিত্তরঞ্জন দাশের বিদ্যালয়জীবনের সূচনা হয় ভবানীপুরের মিশনারি স্কুলে। অল্প বয়সেই তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন এবং শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি ছাত্রসমাজের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

১৮৯০ সালে তিনি বি.এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ডে যান। সেখানে তিনি আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং মিডল টেম্পল থেকে ব্যারিস্টারি পাশ করে দেশে ফিরে আসেন।

শিক্ষায় মেধা

শিক্ষাজীবনে তিনি অধ্যবসায় ও মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন।

আইনশিক্ষা

ইংল্যান্ডে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে ব্যারিস্টার হিসেবে দেশে ফেরেন।

দেশের প্রতি আগ্রহ

ছাত্রজীবন থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁর চিন্তাকে প্রভাবিত করেছিল।

আইনজীবী হিসেবে সাফল্য

দেশে ফিরে চিত্তরঞ্জন দাশ আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর অসাধারণ যুক্তিবোধ, আইনের জ্ঞান এবং বক্তৃতার দক্ষতা তাঁকে একজন খ্যাতনামা আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

কিন্তু তাঁর কাছে আইনজীবী হিসেবে সাফল্যই জীবনের শেষ লক্ষ্য ছিল না। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ব্রিটিশ শাসনের অন্যায় তাঁকে ক্রমশ জাতীয় আন্দোলনের দিকে নিয়ে যায়।

আলিপুর বোমা মামলা ও দেশপ্রেম

বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের সময় বাংলায় জাতীয়তাবাদী চেতনা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই সময় বহু বিপ্লবী ও জাতীয়তাবাদী নেতা ব্রিটিশ সরকারের রোষের শিকার হন।

আলিপুর বোমা মামলায় অরবিন্দ ঘোষসহ কয়েকজন বিপ্লবীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হলে চিত্তরঞ্জন দাশ তাঁদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে দাঁড়ান। তাঁর শক্তিশালী যুক্তি, আইনের গভীর জ্ঞান এবং অসাধারণ সওয়াল এই মামলায় বিশেষ গুরুত্ব পায়।

আলিপুর বোমা মামলায় অবদান

চিত্তরঞ্জন দাশ অরবিন্দ ঘোষের পক্ষে দৃঢ়ভাবে আইনি লড়াই করেন। তাঁর দক্ষ সওয়াল ও যুক্তি এই মামলায় তাঁকে জাতীয় জীবনে বিশেষ পরিচিতি দিয়ে যায়।

স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগদান

আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও চিত্তরঞ্জন দাশ দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে নিজেকে ক্রমশ আরও বেশি যুক্ত করেন। তিনি জাতীয় আন্দোলনের একজন সক্রিয় নেতা হয়ে ওঠেন এবং সাধারণ মানুষকে স্বাধীনতার আন্দোলনে যুক্ত করার চেষ্টা করেন।

তিনি অহিংস আন্দোলনের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন এবং মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন। দেশের স্বাধীনতার জন্য ব্যক্তিগত সম্পদ ও সুবিধা ত্যাগ করতেও তিনি দ্বিধা করেননি।

দেশের জন্য সম্পদ ত্যাগ

দেশের কাজে নিজের বাড়ি ও সম্পদ ব্যবহারের জন্য তিনি উদারভাবে এগিয়ে আসেন। তাঁর দান করা বাড়িতে পরবর্তীকালে চিত্তরঞ্জন সেবাসদনের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এই ঘটনা তাঁর সমাজসেবামূলক মনোভাবের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

কারাবরণ ও রাজনৈতিক সংগ্রাম

স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর জনপ্রিয়তা ও প্রভাব বাড়তে থাকায় ব্রিটিশ সরকার তাঁকে বন্দি করে। কিন্তু কারাবাস তাঁর রাজনৈতিক আদর্শকে দুর্বল করতে পারেনি। বরং দেশের মানুষের মধ্যে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে যায়।

তিনি দেশের তরুণদের জাতীয় আন্দোলনের দিকে আকৃষ্ট করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্ব অনেক তরুণকে দেশের কাজে আত্মনিয়োগে অনুপ্রাণিত করেছিল।

স্বরাজ্য দল গঠন

জাতীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে চিত্তরঞ্জন দাশ স্বরাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন রাজনৈতিক পথ গ্রহণ করেন। মতিলাল নেহরুর সঙ্গে তিনি স্বরাজ্য দল গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

এই দলের লক্ষ্য ছিল আইনসভায় প্রবেশ করে ব্রিটিশ সরকারের নীতির বিরোধিতা করা এবং স্বরাজের দাবিকে আরও শক্তিশালী করা। বাংলায় তিনি এই রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রধান নেতাদের অন্যতম হয়ে ওঠেন।

ক্ষেত্র চিত্তরঞ্জন দাশের ভূমিকা
আইন খ্যাতনামা ব্যারিস্টার হিসেবে জাতীয়তাবাদীদের পক্ষে আইনি লড়াই।
স্বাধীনতা আন্দোলন ব্রিটিশবিরোধী জাতীয় আন্দোলনে সক্রিয় নেতৃত্ব।
রাজনীতি স্বরাজ্য দলের অন্যতম প্রধান নেতা।
জনসেবা নিজের সম্পদ ও সামর্থ্য দেশের মানুষের কাজে ব্যবহার।

কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র

চিত্তরঞ্জন দাশ কলকাতা কর্পোরেশনের প্রথম মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই দায়িত্বের মাধ্যমে তিনি শহরের প্রশাসন ও জনসেবার সঙ্গে আরও প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হন।

তাঁর কাছে রাজনীতি কেবল ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যম ছিল না। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি, শিক্ষা এবং সমাজকল্যাণের বিষয়গুলিও তাঁর চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

দেশবন্ধু উপাধি

চিত্তরঞ্জন দাশের দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ এবং সাধারণ মানুষের প্রতি আন্তরিকতার জন্য দেশবাসী তাঁকে ভালোবেসে ‘দেশবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে।

এই নামটি শুধু একটি সম্মানসূচক উপাধি ছিল না; এটি ছিল মানুষের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্কের প্রকাশ। তিনি দেশের মানুষের দুঃখ-কষ্টকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের জীবনের প্রধান শিক্ষা ছিল—দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কাছে ব্যক্তিগত স্বার্থকে তুচ্ছ করা এবং মানুষের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করা।

সাহিত্যপ্রেম ও সাহিত্যচর্চা

চিত্তরঞ্জন দাশ শুধু রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী ছিলেন না; সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতিও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি নিজেও সাহিত্যচর্চা করতেন এবং বাংলা সাহিত্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য রচনা রেখে গেছেন।

তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্যে অন্তর্যামী, মালঞ্চ এবং সাগর সঙ্গীত উল্লেখযোগ্য। তাঁর সাহিত্যপ্রেম তাঁর বহুমুখী ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে।

সমাজসেবা ও মানবিকতা

দেশের স্বাধীনতার পাশাপাশি মানুষের কল্যাণের প্রতিও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী শিক্ষা, চিকিৎসা এবং সমাজকল্যাণমূলক কাজে সাহায্য করতেন।

  • দেশের মানুষের কল্যাণে ব্যক্তিগত সম্পদ ব্যবহার করেছিলেন।
  • জাতীয় শিক্ষার প্রসারে উৎসাহ দিয়েছিলেন।
  • স্বাধীনতা আন্দোলনে সাধারণ মানুষকে যুক্ত করেছিলেন।
  • সমাজের দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
  • জনসেবাকে রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেছিলেন।

দেহত্যাগ

দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও অসুস্থতার পর দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ১৯২৫ সালের ১৬ জুন দার্জিলিংয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর সংবাদে সারা দেশে গভীর শোক নেমে আসে।

তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন একজন শক্তিশালী ও জনপ্রিয় নেতাকে হারায়। তবে তাঁর আদর্শ, দেশপ্রেম এবং মানুষের জন্য আত্মত্যাগ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে থেকে যায়।

চিত্তরঞ্জন দাশের জীবন থেকে শিক্ষা

গুণ জীবনের শিক্ষা
দেশপ্রেম দেশের স্বার্থকে ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখা।
ত্যাগ মহৎ উদ্দেশ্যের জন্য ব্যক্তিগত সুবিধা বিসর্জন দেওয়া।
সাহস অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেওয়া।
মানবিকতা সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করা।
নেতৃত্ব মানুষকে একটি বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনের পথে ঐক্যবদ্ধ করা।

উপসংহার

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাঁর জীবনে দেশপ্রেম, আইনজীবী হিসেবে দক্ষতা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সাহিত্যপ্রেম ও সমাজসেবা একসঙ্গে মিলিত হয়েছিল।

স্বাধীনতার জন্য তিনি নিজের সফল আইনজীবী জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যকে বিসর্জন দিয়েছিলেন। আলিপুর বোমা মামলায় তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা, স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব, স্বরাজ্য দল গঠন এবং সাধারণ মানুষের জন্য তাঁর আত্মত্যাগ তাঁকে ভারতের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।

শেষ কথা

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের জীবন আমাদের দেশপ্রেম, সাহস, আত্মত্যাগ ও মানবসেবার শিক্ষা দেয়। দেশের মানুষের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করার যে আদর্শ তিনি রেখে গেছেন, তা আজও সমানভাবে অনুপ্রেরণাদায়ক।

Frequently Asked Questions