দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমল বাংলা রচনা | Birendranath Sasmal Bangla Rachana
দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমল ছিলেন বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন সাহসী ও জনদরদি নেতা। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষা এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁর নির্ভীক ভূমিকা তাঁকে বাংলার ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।
মেদিনীপুরের মানুষের সঙ্গে তাঁর গভীর যোগাযোগ ছিল। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, জনসাধারণের পাশে দাঁড়ানো এবং দেশের স্বার্থে ব্যক্তিগত সুবিধা ত্যাগ করার মানসিকতার জন্য তিনি ‘দেশপ্রাণ’ নামে পরিচিত হন।
দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমল – বাংলা রচনা
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| নাম | বীরেন্দ্রনাথ শাসমল |
| পরিচিতি | দেশপ্রাণ |
| জন্ম | ২৬ অক্টোবর, ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দ |
| জন্মস্থান | চণ্ডীভেটি, কাঁথি, পূর্ব মেদিনীপুর |
| পিতার নাম | বিশ্বম্ভর শাসমল |
| মাতার নাম | আনন্দময়ী দেবী |
| মৃত্যু | ২৪ নভেম্বর, ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দ |
ভূমিকা
ব্রিটিশ শাসনের সময় ভারতবর্ষ রাজনৈতিক পরাধীনতা ও নানা ধরনের শোষণের মধ্যে ছিল। দেশের স্বাধীনতার জন্য সেই সময় বহু মানুষ নিজেদের জীবন, অর্থ ও ব্যক্তিগত স্বার্থকে তুচ্ছ করে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। বাংলার এমনই এক সাহসী নেতা ছিলেন বীরেন্দ্রনাথ শাসমল।
তিনি শুধু স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মী ছিলেন না; সাধারণ মানুষের অধিকার এবং মেদিনীপুরের মানুষের স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর দৃঢ়তা, সততা ও আত্মত্যাগের জন্য দেশবাসী তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে ‘দেশপ্রাণ’ উপাধিতে স্মরণ করে।
জন্ম ও বংশপরিচয়
বীরেন্দ্রনাথ শাসমল ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দের ২৬ অক্টোবর পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁথির চণ্ডীভেটি গ্রামে একটি জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল বিশ্বম্ভর শাসমল এবং মাতার নাম আনন্দময়ী দেবী।
তাঁর পরিবারে ব্রাহ্মধর্মের প্রভাব ছিল। জাতিভেদ প্রথার প্রতি তাঁর পরিবারের অনীহা ছিল এবং তাঁদের বাড়িতে মেদিনীপুর জেলার প্রথম দিকের বালিকা শিক্ষার উদ্যোগেরও উল্লেখ পাওয়া যায়। ছোটবেলা থেকেই তিনি এমন এক সময়ের পরিবেশ দেখেছিলেন, যখন ভারত ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল।
শিক্ষাজীবন
বীরেন্দ্রনাথ শাসমল কাঁথির উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতায় আসেন এবং মেট্রোপলিটন কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে রিপন কলেজেও অধ্যয়ন করেন।
তাঁর শিক্ষাজীবনে রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহচর্য তাঁর চিন্তাভাবনায় প্রভাব ফেলেছিল। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ বাড়তে থাকে এবং তিনি আইনকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে গ্রহণের প্রস্তুতি নেন।
স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগদান
বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, বীরেন্দ্রনাথ শাসমল তাতেও সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি মেদিনীপুরের মানুষের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিও তাঁর কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
তিনি মহাত্মা গান্ধির অহিংস নীতিতে বিশ্বাস করতেন। তবে স্বাধীনতা সংগ্রামে কোনো বিপ্লবী বা আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে মামলা হলে আইনজীবী হিসেবে তাঁদের পাশে দাঁড়াতেও তিনি পিছপা হননি।
মেদিনীপুর জেলা বিভাজনের বিরোধিতা
মেদিনীপুর জেলা বিভাজনের উদ্যোগের বিরুদ্ধে বীরেন্দ্রনাথ শক্তিশালী প্রতিবাদ গড়ে তোলেন। যুক্তি ও সংগঠিত আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করেন।
জেলা বিভাজনের বিরোধিতা নিয়ে তিনি একটি পুস্তিকাও রচনা করেছিলেন, যা ‘Midnapore Partition’ নামে পরিচিত। এই আন্দোলনের ফলে জেলা বিভাজনের উদ্যোগের বিরুদ্ধে জনমত আরও শক্তিশালী হয়।
ইউনিয়ন বোর্ড বিরোধী আন্দোলন
১৯১৯ সালে গ্রাম্য স্বায়ত্তশাসনের নামে ইউনিয়ন বোর্ড ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলে বীরেন্দ্রনাথ শাসমল তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। এই ব্যবস্থার ফলে সাধারণ গ্রামবাসীর ওপর চৌকিদারি করের বোঝা বাড়ার আশঙ্কা ছিল।
তিনি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁর নেতৃত্বে প্রতিবাদ এতটাই শক্তিশালী হয় যে সরকারকে বহু ইউনিয়ন বোর্ড প্রত্যাহার করতে হয়।
সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝার বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন।
মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে আন্দোলনকে সংগঠিত করেছিলেন।
তাঁর আন্দোলনের চাপে বহু ইউনিয়ন বোর্ড প্রত্যাহার করা হয়।
আইনজীবী হিসেবে ভূমিকা
বীরেন্দ্রনাথ শাসমল ছিলেন একজন দক্ষ আইনজীবী। আইনজ্ঞানকে তিনি কেবল ব্যক্তিগত পেশা হিসেবে দেখেননি; মানুষের অধিকার রক্ষা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রেও তা ব্যবহার করেছিলেন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলা ও আন্দোলন-সংক্রান্ত ঘটনায় তিনি আইনগত সহায়তা দিয়েছেন। এমনকি স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পক্ষে অনেক সময় বিনা পারিশ্রমিকেও মামলা লড়েছেন।
আইন পেশা ত্যাগ
দেশের স্বাধীনতার উদ্দেশ্যে তিনি শেষ পর্যন্ত আইন ব্যবসার ব্যক্তিগত সুবিধা ত্যাগ করেন। সেই সময় তাঁর আয় যথেষ্ট হলেও দেশের স্বার্থকে তিনি ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের ওপরে স্থান দেন।
তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
ব্যক্তিগত সাফল্য ও আর্থিক সুবিধার চেয়ে দেশের মানুষের অধিকার এবং বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াই ছিল বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা
মেদিনীপুরে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তাঁর নেতৃত্বে আন্দোলন ক্রমশ শক্তিশালী হওয়ায় ব্রিটিশ প্রশাসনও তাঁর কার্যকলাপের প্রতি নজর দেয়।
তাঁকে মেদিনীপুরে প্রবেশ করা থেকে বিরত রাখার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৪৪ ধারা প্রয়োগ করা হয়েছিল। তবুও মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি তাঁর অবস্থান থেকে সরে আসেননি।
অসহযোগ আন্দোলনের সময় ভূমিকা
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি অন্যান্য জাতীয়তাবাদী নেতাদের সঙ্গে কাজ করেন। ইংল্যান্ডের যুবরাজের ভারত সফরের প্রতিবাদে হরতালের আহ্বান জানানো এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি গ্রেফতারও হন।
তাঁর সঙ্গে সেই সময় চিত্তরঞ্জন দাশ ও সুভাষচন্দ্র বসু-র মতো নেতারাও ব্রিটিশ সরকারের হাতে গ্রেফতার হন এবং কারাদণ্ড ভোগ করেন।
জনসেবামূলক কাজ ও প্রশাসনিক দায়িত্ব
বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের কর্মকাণ্ড শুধু স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। মেদিনীপুর জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি প্রশাসনিক কাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক দায়িত্বে থেকে তিনি মানুষের উন্নয়নের বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।
বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের জীবনের উল্লেখযোগ্য সময়রেখা
২৬ অক্টোবর কাঁথির চণ্ডীভেটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
কাঁথির উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে মেদিনীপুরে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নেন।
গ্রামবাসীর ওপর অতিরিক্ত করের বোঝার বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিবাদ গড়ে তোলেন।
২৪ নভেম্বর দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের জীবনাবসান হয়।
দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের আদর্শ
বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের জীবন থেকে দেশপ্রেম, সাহস, সততা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার শিক্ষা পাওয়া যায়। তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে চাননি এবং দেশের স্বার্থকে ব্যক্তিগত সুবিধার ওপরে স্থান দিয়েছিলেন।
অহিংস পদ্ধতির প্রতি তাঁর বিশ্বাস থাকলেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ে তিনি দৃঢ় ছিলেন। সাধারণ মানুষের সমস্যা নিজের সমস্যা হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতাই তাঁকে একজন জননেতা হিসেবে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছিল।
দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগ
দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের পেশা ও ব্যক্তিগত সুবিধা ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত তাঁর আত্মত্যাগের অন্যতম উদাহরণ। ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে উচ্চপদ গ্রহণের সুযোগ এলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি—দেশের প্রতি তাঁর অবস্থান ছিল দৃঢ়।
“মানুষের জন্য কাজ করা এবং দেশের স্বার্থকে ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখা”—বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের জীবন ও কর্মের এই মূল আদর্শই তাঁকে ‘দেশপ্রাণ’ হিসেবে স্মরণীয় করে রেখেছে।
মৃত্যু ও স্মরণ
বীরেন্দ্রনাথ শাসমল ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের ২৪ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পরেও তাঁর জীবন ও কর্ম বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার যে আদর্শ রেখে গিয়েছেন, তা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম পরিচয়। দেশের মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা এবং স্বাধীনতার জন্য তাঁর সংগ্রাম তাঁকে ইতিহাসে একটি বিশেষ স্থান দিয়েছে।
উপসংহার
দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমল ছিলেন এমন একজন দেশনেতা, যাঁর জীবনে দেশপ্রেম ও জনসেবার সমন্বয় ঘটেছিল। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে।
তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে সত্যিকারের দেশপ্রেম শুধু কথায় প্রকাশ পায় না; প্রয়োজনে ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে প্রতিবাদ করার মধ্য দিয়েই তার প্রকৃত প্রকাশ ঘটে। তাই বীরেন্দ্রনাথ শাসমল আজও বাংলার ইতিহাসে একজন নির্ভীক দেশপ্রেমিক ও জননেতা হিসেবে স্মরণীয়।
