বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান Bangla Bhashay Bigyan – মাধ্যমিক বাংলা প্রশ্ন ও উত্তর | Rajshekhar Basu
‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান’ রাজশেখর বসুর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ, যেখানে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার প্রয়োজনীয়তা, সমস্যা এবং সম্ভাবনা নিয়ে যুক্তিনির্ভর আলোচনা করা হয়েছে। লেখক দেখিয়েছেন, বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হলে শুধু বিজ্ঞান জানা যথেষ্ট নয়; সেই বিজ্ঞানকে সহজ, স্বাভাবিক ও বোধগম্য বাংলায় প্রকাশ করাও জরুরি।
এই প্রবন্ধে বিজ্ঞানভিত্তিক বাংলা বইয়ের পাঠকদের দুটি শ্রেণি, বাংলা পারিভাষিক শব্দের অভাব, বৈজ্ঞানিক রচনায় আক্ষরিক অনুবরের সমস্যা এবং যথার্থ পরিভাষার গুরুত্ব বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নিচে বিষয়ভিত্তিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ MCQ, অতিসংক্ষিপ্ত, সংক্ষিপ্ত এবং রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর সাজানো হয়েছে।
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান – প্রবন্ধ পরিচিতি
| শ্রেণি | দশম শ্রেণি (মাধ্যমিক) |
|---|---|
| বিষয় | বাংলা |
| প্রবন্ধের নাম | বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান |
| লেখক | রাজশেখর বসু |
| রচনার ধরন | প্রবন্ধ |
প্রবন্ধের মূল বক্তব্য
রাজশেখর বসু মনে করেন, বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য মাতৃভাষার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা করতে গেলে পাঠকের ভাষাগত অভ্যাস, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, বাংলা পারিভাষিক শব্দ এবং লেখকের ভাষারীতি—সবকিছুকেই গুরুত্ব দিতে হয়।
লেখক বিজ্ঞানবিষয়ক বাংলা গ্রন্থের পাঠকদের মূলত দুটি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। এক শ্রেণির পাঠক ইংরেজি জানেন না বা খুব অল্প জানেন। অন্য শ্রেণির পাঠক ইংরেজি জানেন এবং ইংরেজিতে বিজ্ঞান পড়েছেন। দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠকের ক্ষেত্রে ইংরেজি পরিভাষার অভ্যাস বাংলায় বিজ্ঞান পড়ার সময় কিছুটা বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
একই সঙ্গে লেখক বাংলা বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে উপযুক্ত পারিভাষিক শব্দের অভাবের সমস্যাটিও তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, পরিভাষা সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া উচিত নয়; বরং প্রয়োজনমতো সহজ ব্যাখ্যার সাহায্যে যথার্থ পরিভাষা ব্যবহার করা উচিত।
MCQ Questions & Answers – বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান
(A) একটি শ্রেণিতে
(B) দুটি শ্রেণিতে
(C) তিনটি শ্রেণিতে
(D) চারটি শ্রেণিতে উত্তর: (B) দুটি শ্রেণিতে
(A) প্রথম শ্রেণি
(B) দ্বিতীয় শ্রেণি
(C) তৃতীয় শ্রেণি
(D) কোনো শ্রেণি নয় উত্তর: (A) প্রথম শ্রেণি
(A) প্রথম শ্রেণি
(B) দ্বিতীয় শ্রেণি
(C) তৃতীয় শ্রেণি
(D) চতুর্থ শ্রেণি উত্তর: (B) দ্বিতীয় শ্রেণি
(A) অ্যালুমিনিয়াম
(B) স্টিল
(C) পারদ
(D) সোনা উত্তর: (A) অ্যালুমিনিয়াম
(A) গোলাপ–গাঁদা
(B) অশোক–পলাশ
(C) লাউ–কুমড়ো
(D) পুঁই–পালং উত্তর: (C) লাউ–কুমড়ো
(A) হিন্দি
(B) সংস্কৃত
(C) ইংরেজি
(D) উর্দু উত্তর: (C) ইংরেজি
(A) ব্রহ্মমোহন মল্লিক
(B) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(C) শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
(D) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উত্তর: (A) ব্রহ্মমোহন মল্লিক
(A) বাংলা ভাষার দৈর্ঘ্য
(B) বাংলা পারিভাষিক শব্দের অভাব
(C) বাংলা ব্যাকরণ
(D) বাংলা বানান উত্তর: (B) বাংলা পারিভাষিক শব্দের অভাব
(A) বিজ্ঞান শিক্ষা দিয়েছিলেন
(B) বিভিন্ন বিষয়ের পরিভাষা রচনা করেছিলেন
(C) সংবাদপত্র প্রকাশ করেছিলেন
(D) অভিধান প্রকাশ করেছিলেন উত্তর: (B) বিভিন্ন বিষয়ের পরিভাষা রচনা করেছিলেন
(A) তাঁরা কাজ করেননি
(B) তাঁরা একযোগে কাজ করেননি
(C) তাঁরা ইংরেজি ব্যবহার করেছিলেন
(D) তাঁরা কোনো শব্দ তৈরি করেননি উত্তর: (B) তাঁরা একযোগে কাজ করেননি
(A) ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে
(B) ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে
(C) ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে
(D) ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে উত্তর: (C) ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে
(A) শুধু লেখক
(B) শুধু বিজ্ঞানী
(C) বিজ্ঞান অধ্যাপক, ভাষাতত্ত্ববিদ, সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত ও লেখক
(D) শুধু ছাত্র উত্তর: (C) বিজ্ঞান অধ্যাপক, ভাষাতত্ত্ববিদ, সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত ও লেখক
(A) খুব বড়ো
(B) অত্যন্ত ছোটো
(C) খুব বড়ো নয়
(D) সম্পূর্ণ উত্তর: (C) খুব বড়ো নয়
(A) লেখা বন্ধ করতে
(B) ইংরেজি শব্দ বাংলা বানানে ব্যবহার করতে
(C) সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করতে
(D) শব্দ বাদ দিতে উত্তর: (B) ইংরেজি শব্দ বাংলা বানানে ব্যবহার করতে
(A) সাহিত্যিক জ্ঞান
(B) রাজনৈতিক জ্ঞান
(C) বৈজ্ঞানিক জ্ঞান
(D) ঐতিহাসিক জ্ঞান উত্তর: (C) বৈজ্ঞানিক জ্ঞান
(A) সাহিত্য
(B) বৈজ্ঞানিক রচনা
(C) ইতিহাস
(D) কবিতা উত্তর: (B) বৈজ্ঞানিক রচনা
(A) General Science
(B) Popular Science
(C) Modern Science
(D) Public Science উত্তর: (B) Popular Science
(A) ইংরেজি শিক্ষা বন্ধ হলে
(B) বিজ্ঞানশিক্ষার বিস্তার হলে
(C) শুধু সংস্কৃত শেখানো হলে
(D) পারিভাষিক শব্দ বাদ দিলে উত্তর: (B) বিজ্ঞানশিক্ষার বিস্তার হলে
(A) স্পর্শকাতর কাগজ
(B) সুগ্রাহী কাগজ
(C) ব্যথাপ্রবণ কাগজ
(D) নরম কাগজ উত্তর: (B) সুগ্রাহী কাগজ
(A) পরমাণু ইঞ্জিন নীলচিত্রে পৌঁছায়নি
(B) পরমাণু ইঞ্জিনের নকশা পর্যন্ত এখনও প্রস্তুত হয়নি
(C) পরমাণু ইঞ্জিন নীল হয়ে গেছে
(D) পরমাণু ইঞ্জিনের নীলচিত্র তৈরি হয়েছে উত্তর: (B) পরমাণু ইঞ্জিনের নকশা পর্যন্ত এখনও প্রস্তুত হয়নি
(A) ভাষাকে দীর্ঘ করা
(B) ভাষাকে সংক্ষিপ্ত ও অর্থকে সুনির্দিষ্ট করা
(C) কঠিন শব্দ ব্যবহার করা
(D) ইংরেজি বাদ দেওয়া উত্তর: (B) ভাষাকে সংক্ষিপ্ত ও অর্থকে সুনির্দিষ্ট করা
অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর – Very Short Questions
গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা – Quick Revision
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর – Short Questions
রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর – Descriptive Questions
১. বিজ্ঞান বিষয়ক বাংলা গ্রন্থের পাঠকদের দুটি শ্রেণির পরিচয় দাও।
রাজশেখর বসুর মতে বিজ্ঞান বিষয়ক বাংলা গ্রন্থের পাঠকদের মোটামুটি দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। প্রথম শ্রেণির পাঠকেরা ইংরেজি জানেন না অথবা অতি অল্প জানেন। সাধারণত অল্পবয়স্ক ছেলেমেয়ে এবং অল্পশিক্ষিত বয়স্ক মানুষ এই শ্রেণির মধ্যে পড়েন। তাঁদের কিছু সাধারণ বৈজ্ঞানিক তথ্য জানা থাকলেও সুসংগঠিত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সবসময় থাকে না।
দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠকেরা ইংরেজি জানেন এবং ইংরেজি ভাষায় কমবেশি বিজ্ঞান পড়েছেন। ফলে তাঁদের ইংরেজি বৈজ্ঞানিক পরিভাষার সঙ্গে পরিচিতি থাকে। বাংলায় একই বিষয় পড়ার সময় নতুন বাংলা পরিভাষার সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাঁদের কিছুটা বেশি চেষ্টা করতে হয়।
লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণির পাঠকেরা ইংরেজির প্রভাব থেকে তুলনামূলক মুক্ত হওয়ায় বাংলায় বিজ্ঞান পড়তে সুবিধা পান। দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠকদের ক্ষেত্রে ইংরেজির পূর্বাভ্যাস কখনও কখনও মানসিক বাধা সৃষ্টি করে।
২. ‘যে লোক আজন্ম ইজার পরেছে তার পক্ষে হঠাৎ ধুতি পরা অভ্যাস করা একটু শক্ত’—উক্তিটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
এখানে ‘ইজার’ ও ‘ধুতি’ শব্দ দুটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ‘ইজার’ দ্বারা ইংরেজি ভাষা এবং ‘ধুতি’ দ্বারা বাংলা ভাষাকে বোঝানো হয়েছে। যে ব্যক্তি ছোটোবেলা থেকেই ইংরেজি ভাষায় পড়াশোনা করেছেন, তাঁর কাছে ইংরেজি পরিভাষা ও ভাষারীতি স্বাভাবিক হয়ে যায়।
তাই হঠাৎ বাংলা ভাষায় একই বৈজ্ঞানিক বিষয় পড়তে গেলে নতুন বাংলা পরিভাষা গ্রহণে তাঁর কিছুটা অসুবিধা হতে পারে। লেখক পোশাক পরিবর্তনের উদাহরণ দিয়ে ভাষাগত অভ্যাসের এই পরিবর্তনকে সহজভাবে বোঝাতে চেয়েছেন।
৩. বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার প্রধান বাধাগুলি আলোচনা করো।
রাজশেখর বসু বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার পথে একাধিক বাধার কথা বলেছেন। প্রথমত, ইংরেজি জানা এবং ইংরেজিতে বিজ্ঞান পড়া পাঠকদের বাংলা পরিভাষার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সমস্যা হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, যথেষ্ট প্রামাণিক ও সর্বসম্মত বাংলা পারিভাষিক শব্দের অভাব রয়েছে। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ এবং কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান পরিভাষা রচনার উদ্যোগ নিলেও কাজটি সম্পূর্ণ হয়নি।
তৃতীয়ত, পাশ্চাত্য দেশের তুলনায় সাধারণ মানুষের প্রাথমিক বিজ্ঞানজ্ঞান তুলনামূলকভাবে কম। ফলে সাধারণ পাঠকের জন্য উচ্চতর বৈজ্ঞানিক বিষয় সহজ করে লেখা কঠিন হয়ে পড়ে।
চতুর্থত, অনেক লেখকের ভাষা আড়ষ্ট এবং ইংরেজি থেকে আক্ষরিক অনুবরের প্রবণতা রয়েছে। এর ফলে বৈজ্ঞানিক রচনা স্বাভাবিক ও সাবলীল থাকে না। এছাড়া ভুল তথ্য দেওয়া এবং পরিভাষা সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার ভুল ধারণাও সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
৪. বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের পরিভাষা রচনার উদ্যোগের ত্রুটি কী ছিল?
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তি বিভিন্ন বিষয়ের বাংলা পরিভাষা রচনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য প্রশংসনীয় হলেও কাজের পদ্ধতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি ছিল।
তাঁরা একসঙ্গে বা সম্মিলিতভাবে কাজ না করে পৃথকভাবে পরিভাষা রচনা করেছিলেন। ফলে একই ইংরেজি শব্দের জন্য বিভিন্ন বাংলা প্রতিশব্দ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এতে পরিভাষায় ঐক্য ও সামঞ্জস্য নষ্ট হয় এবং পাঠকের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
লেখকের মতে, সবাই যদি সম্মিলিতভাবে কাজ করতেন, তাহলে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য ও সুসংহত পরিভাষা তৈরি করা সহজ হত।
৫. কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিভাষা সমিতির উদ্যোগের সাফল্য আলোচনা করো।
১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে বিভিন্ন বিষয়ের পারিভাষিক শব্দ রচনার জন্য একটি সমিতি গঠিত হয়। এই সমিতিতে বিভিন্ন বিজ্ঞানের অধ্যাপক, ভাষাতত্ত্ববিদ, সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত এবং কয়েকজন লেখক ছিলেন।
এই উদ্যোগের একটি বিশেষ সুবিধা ছিল—সদস্যরা সম্মিলিতভাবে কাজ করেছিলেন। ফলে আগের মতো বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করার সমস্যা কমে যায় এবং পরিভাষায় তুলনামূলকভাবে বেশি সামঞ্জস্য আসে।
তবে লেখকের মতে, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিভাষা সংকলন খুব বড়ো ছিল না। আরও অনেক শব্দের প্রয়োজন ছিল। তাই বাংলা বৈজ্ঞানিক সাহিত্যের জন্য ভবিষ্যতেও পরিভাষা রচনার কাজ চালিয়ে যাওয়া দরকার।
৬. ‘এ দেশে বিজ্ঞান শিক্ষার বিস্তার হলে এই অসুবিধা দূর হবে’—কোন অসুবিধার কথা বলা হয়েছে?
এখানে সাধারণ মানুষের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের স্বল্পতার কথা বলা হয়েছে। পাশ্চাত্য দেশগুলিতে সাধারণ পাঠকের মধ্যে প্রাথমিক বিজ্ঞানের ধারণা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকায় তাঁদের জন্য Popular Science বা সাধারণের উপযোগী বিজ্ঞানভিত্তিক লেখা তৈরি করা সহজ।
কিন্তু আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের বিজ্ঞান সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান তুলনামূলকভাবে কম থাকায় বিজ্ঞানভিত্তিক সাহিত্য বোঝাতে লেখককে অনেক বেশি প্রাথমিক বিষয় ব্যাখ্যা করতে হয়। ফলে রচনার কাজ কঠিন হয়ে পড়ে।
বিজ্ঞানশিক্ষার বিস্তার ঘটলে সাধারণ মানুষের বিজ্ঞানবোধ বৃদ্ধি পাবে এবং বৈজ্ঞানিক সাহিত্য সহজে বোঝা সম্ভব হবে। এই কারণেই লেখক বিজ্ঞানশিক্ষার প্রসারের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
৭. বৈজ্ঞানিক রচনায় আক্ষরিক অনুবাদের দোষ কী? উদাহরণসহ আলোচনা করো।
ইংরেজি বৈজ্ঞানিক বাক্যকে শব্দে-শব্দে বাংলায় অনুবাদ করলে অনেক সময় বাংলা ভাষার স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়। ইংরেজি বাক্যের গঠন বাংলায় হুবহু বসিয়ে দিলে বাক্যটি অস্বাভাবিক ও দুর্বোধ্য শোনাতে পারে।
লেখক ‘The atomic engine has not even reached the blue print stage’ বাক্যটির উদাহরণ দিয়েছেন। আক্ষরিক অনুবাদ করলে বাক্যটি অস্বাভাবিক হয়ে যায়। তার পরিবর্তে ‘পরমাণু ইঞ্জিনের নকশা পর্যন্ত এখনও প্রস্তুত হয়নি’ বললে মূল ভাবটি স্বাভাবিক ও সহজ বাংলায় প্রকাশ পায়।
একইভাবে ‘Sensitized Paper’-এর ক্ষেত্রে ‘স্পর্শকাতর কাগজ’ বলার পরিবর্তে ‘সুগ্রাহী কাগজ’ বলা অধিক অর্থবহ। অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক অনুবরে মূল ভাব বজায় রেখে বাংলা ভাষার স্বাভাবিক রীতিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
৮. ‘এই ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়’—কোন ধারণার কথা বলা হয়েছে? লেখকের বক্তব্য ব্যাখ্যা করো।
অনেকে মনে করেন, বৈজ্ঞানিক রচনায় পারিভাষিক শব্দ বাদ দিয়ে সাধারণ ভাষায় বিষয় প্রকাশ করলে রচনা আরও সহজ হবে। রাজশেখর বসু মনে করেন, এই ধারণা সর্বক্ষেত্রে সঠিক নয়।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে কঠিন পরিভাষার পরিবর্তে সাধারণ ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। কিন্তু সব ক্ষেত্রে তা করা সম্ভব নয়। যেমন, কোনো নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক বিষয়ের একটি যথার্থ পরিভাষা থাকলে তার পরিবর্তে দীর্ঘ বর্ণনা দিলে ভাষা অপ্রয়োজনীয়ভাবে বড়ো হয় এবং অর্থের নির্দিষ্টতাও কমে যেতে পারে।
তাই লেখকের মতে পরিভাষা সম্পূর্ণ বর্জন না করে অপরিচিত পরিভাষার প্রথম ব্যবহারের সময় তার অর্থ ব্যাখ্যা করা উচিত। পরবর্তীতে শুধু পরিভাষাটি ব্যবহার করলেই পাঠকের বোঝার সমস্যা থাকে না।
৯. ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান’ প্রবন্ধের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো।
‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান’ নামটি প্রবন্ধটির বিষয়বস্তুর সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। পুরো প্রবন্ধজুড়ে রাজশেখর বসু বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার প্রয়োজন, সমস্যা, সীমাবদ্ধতা এবং সঠিক পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
লেখক একদিকে বিজ্ঞানভিত্তিক বাংলা গ্রন্থের পাঠকদের শ্রেণিবিভাগ করেছেন, অন্যদিকে বাংলা বৈজ্ঞানিক পরিভাষার অভাব ও পরিভাষা রচনার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করেছেন। একই সঙ্গে বিজ্ঞানশিক্ষার বিস্তার এবং সহজ-সাবলীল ভাষায় বিজ্ঞান প্রকাশের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছেন।
ফলে প্রবন্ধের মূল আলোচ্য বিষয় যেহেতু বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা, তাই ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান’ নামটি যথার্থ ও সার্থক।
১০. ‘এই দোষ থেকে মুক্ত না হলে বাংলা বৈজ্ঞানিক সাহিত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হবে না’—‘এই দোষ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এখানে বাংলা বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে ভাষার আড়ষ্টতা এবং ইংরেজি থেকে আক্ষরিক অনুবাদের দোষকে বোঝানো হয়েছে। অনেক লেখক প্রথমে ইংরেজিতে বিষয়টি ভাবেন এবং পরে ইংরেজি বাক্যরীতির কাছাকাছি রেখে বাংলায় অনুবাদ করেন।
এর ফলে বাংলা বাক্য স্বাভাবিক থাকে না এবং পাঠকের কাছে বিষয়টি কঠিন হয়ে ওঠে। বৈজ্ঞানিক বিষয় নিজেই অনেক সময় জটিল হওয়ায় ভাষা যদি আরও আড়ষ্ট হয়, তাহলে সাধারণ পাঠকের পক্ষে তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাই লেখক বিজ্ঞানভিত্তিক রচনায় সহজ, স্বাভাবিক ও প্রাঞ্জল বাংলা ব্যবহারের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রয়োজনমতো ভাবানুবাদ ব্যবহার করে বাংলা ভাষার স্বাভাবিক গতি বজায় রাখা উচিত।
১১. পরিভাষার উদ্দেশ্য কী? বৈজ্ঞানিক রচনায় এর প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করো।
পরিভাষার প্রধান উদ্দেশ্য হল ভাষাকে সংক্ষিপ্ত করা এবং অর্থকে সুনির্দিষ্ট করা। একটি বৈজ্ঞানিক বিষয়ের জন্য যথার্থ পরিভাষা থাকলে বারবার দীর্ঘ বর্ণনার প্রয়োজন হয় না।
পরিভাষা সম্পূর্ণ বাদ দিলে অনেক সময় একই বিষয় বোঝানোর জন্য দীর্ঘ বাক্য লিখতে হয়। এতে রচনা বড়ো হয় এবং বিষয়ের নির্দিষ্টতাও কমে যেতে পারে। তাই বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে যথার্থ ও গ্রহণযোগ্য পরিভাষার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
তবে সাধারণ পাঠকের জন্য লেখা হলে অপরিচিত পরিভাষার প্রথম ব্যবহারের সময় তার অর্থ বা ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত। এতে পরিভাষার সংক্ষিপ্ততা এবং পাঠকের বোধগম্যতা—দুটিই বজায় থাকে।
১২. ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান’ প্রবন্ধে বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে ভাষার ভূমিকা আলোচনা করো।
বিজ্ঞান একটি বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান। কিন্তু সেই জ্ঞান মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ভাষার প্রয়োজন। ভাষা যদি দুর্বোধ্য, আড়ষ্ট বা অস্বাভাবিক হয়, তাহলে বৈজ্ঞানিক বিষয়ের প্রকৃত অর্থ পাঠকের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
রাজশেখর বসু তাই বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান লেখার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ও সাবলীল ভাষার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ইংরেজি থেকে আক্ষরিক অনুবাদ না করে মূল ভাবকে সহজ বাংলায় প্রকাশ করতে হবে।
একই সঙ্গে যথার্থ পারিভাষিক শব্দ ব্যবহার করতে হবে। কারণ পরিভাষা ভাষাকে সংক্ষিপ্ত ও অর্থকে সুনির্দিষ্ট করে। তবে অপরিচিত পরিভাষা প্রথমবার ব্যবহারের সময় তার অর্থ ব্যাখ্যা করা দরকার।
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান – পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এক নজরে
| প্রবন্ধ | বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান |
|---|---|
| লেখক | রাজশেখর বসু |
| পাঠকের শ্রেণি | দুটি |
| প্রথম শ্রেণির পাঠক | যারা ইংরেজি জানেন না বা অল্প জানেন |
| দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠক | যারা ইংরেজি জানেন এবং ইংরেজিতে বিজ্ঞান পড়েছেন |
| গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান | বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় |
| পরিভাষা সমিতি | কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দ |
| Popular Science | সাধারণ পাঠকের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক রচনা |
| পরিভাষার উদ্দেশ্য | ভাষাকে সংক্ষিপ্ত ও অর্থকে সুনির্দিষ্ট করা |
| শব্দের ত্রিবিধ অর্থ | অভিধা, লক্ষণা ও ব্যঞ্জনা |
উপসংহার
‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান’ প্রবন্ধে রাজশেখর বসু শুধু বাংলায় বিজ্ঞান লেখার পক্ষেই মত প্রকাশ করেননি; তিনি কীভাবে বিজ্ঞানকে বাংলা ভাষায় আরও কার্যকরভাবে প্রকাশ করা যায়, তারও একটি সুস্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন।
তাঁর মতে, যথার্থ পরিভাষা, সহজ ও সাবলীল ভাষা, সঠিক অনুবাদ এবং সাধারণ মানুষের বিজ্ঞানজ্ঞান—এই বিষয়গুলির উন্নতি না হলে বাংলা বৈজ্ঞানিক সাহিত্য শক্তিশালী হয়ে উঠবে না। তাই বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার প্রসারের সঙ্গে বিজ্ঞানশিক্ষার বিস্তারও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে প্রবন্ধটির মূল বক্তব্যের পাশাপাশি পাঠকের দুটি শ্রেণি, পরিভাষা, আক্ষরিক অনুবাদ, বিজ্ঞানশিক্ষার বিস্তার এবং বাংলা বৈজ্ঞানিক সাহিত্যের সমস্যাগুলি ভালোভাবে অনুশীলন করলে এই অধ্যায়টি অনেক সহজে আয়ত্ত করা সম্ভব।
